শহিদ বুদ্ধিজীবী ও ডাকটিকিট প্রসঙ্গ : আমার অপ্রকাশিত বই থেকে

শহিদ বুদ্ধিজীবী ও ডাকটিকিট প্রসঙ্গ : আমার অপ্রকাশিত বই থেকে

সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান,

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত সময় জুড়ে এবং বিশেষ করে, দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত আগে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের পদলেহী, লোভী আলবদর, রাজাকার বাহিনী বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে বেছে বেছে দেশের সূর্যসন্তানদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে যে ভয়াবহ নির্মম হত্যাকাণ্ড, যে গণহত্যা সংঘটিত করেছিল তার নজীর সম্ভবত সারা বিশ্বে আর কোথাও নেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানীর গেস্টাপো বাহিনী সারা ইউরোপজুড়ে ইহুদি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করতে যে গণহত্যা চালিয়েছিল, সেটার সাথে কিংবা স্পেনীয় স্বর্ণলোভী ডাকাতরা মধ্য আমেরিকার ইনকা সভ্যতার মানুষদের যেভাবে হত্যা করেছিল, সেটার সাথে, অথবা ব্রিটেনের সভ্য মানুষেরা উত্তর আমেরিকার অসভ্য রেড ইন্ডিয়ানদেরকে যেভাবে নিশ্চিহ্ন করেছিল, সেটার সাথে হয়তো বাংলাদেশের ঘটনার কিছুটা মিল আছে। কিন্তু সে সব যায়গায় বেছে বেছে অধ্যাপক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, প্রকৌশলী, চিকিৎসক প্রভৃতি সমাজের ধারক ও বাহকদের হত্যা করা হয়নি।

এই হত্যাকাণ্ডের, এই গণহত্যার তুলনা আর একটিও নেই। পুরো জাতি গত ৪৫ বছর যাবত প্রতি মুহূর্তে সেই ভয়াবহ অবিচার, অন্যায়, জিঘাংসা ও রক্তক্ষরণের কথা মনে করে শিহরিত হয়ে উঠে, শিহরিত হয়ে উঠবে চিরকাল।

বিশ্বের সকল দেশের মতো বাংলাদেশও দেশ ও জাতির স্মরণীয় ঘটনা, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সমুন্নত রাখার জন্য প্রতি বৎসর নানা প্রকার ডাকটিকিট প্রকাশ করে থাকে। ১৯৯১ সালের স্বাধীনতার ২০ বৎসর পূর্তি উপলক্ষে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মরণে বাংলাদেশ সরকার দেশের সেই সকল রত্ন, সূর্য সন্তানদের কেবল হৃদয়ের গভীরে না রেখে তাদের স্মরণে ডাকটিকিট প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান হয়। তৎকালীন এবং জ্ঞানী-গুণীর পরামর্শে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

প্রথম পর্যায়ে ৩০ জন বুদ্ধিজীবি স্মরণে ৩০টি ডাকটিকিট প্রকাশ করা হবে। ডাকটিকিটের নক্সা প্রণয়নের দায়িত্ব প্রদান করা হয় বিশেষ্ট চিত্রকর কে জি মোসতফা, প্রাণেশ কুমার মণ্ডল এবং আহমেদ ফজলুল করিম-এর ওপর। এই তিন জন চিত্রকর নিজেরা একটি সভায় মিালিত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে এই ত্রিশটি ডাকটিকিটের আকৃতি, প্রকৃতি ও নক্সা একই প্রকার হবে। কে জি মোসতফা একটি খসড়া নক্সা দাঁড় করান এবং অন্য দুইজন চিত্রকরের মত অনুসারে সেই খসড়া ডাকবিভাগকে দেখানো হলে, সেই ছক তাদেরও পছন্দ হয়। তিনজন চিত্রকর সেই মূল নক্সা মোতাবেক ত্রিশটি ডাকটিকিটের নক্সা প্রস্তুত করেন।

নক্সা ১ ও ২
ডাকটিকিটগুলি একটি চারকোণ বিশিষ্ট কাগজে প্রতি সারিতে পাঁচটি করে দশটি ডাকটিকিট বসানো হয় এবং মাঝের সারিতে মিরপুর বুদ্ধিজীবি স্মৃতিশৌধের এপিটাফটির ছবি প্রতিটি ডাকটিকিটের নিচে একটি করে পাঁচটি ছবি বসানো হয়। ডাকটিকিটগুলি দুটি ভারী কালো রেখা দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে, যার অর্থ দুই দশক, এবং দুটি রেখার মাঝে শহীদ বুদ্ধিজীবি দিবস ৯১ কথাটি বার বার লেখা আছে।

কে জি মোসতফার পরিকল্পনা অনুযায়ী ডাকটিকিটগুলির জন্য একটি উদ্বোধনী খামও প্রস্তুত করা হয়। বেদনার রঙ নীল- এই রঙকে নিয়ে নক্সাকার কে জি মোসতফা রায়েরবাজার বধ্যভূমির চিত্র ও কয়েকটি খণ্ডিত চিত্র এতে সংযোজিত করে এক বেদনাবিধুর আবহ সৃষ্টির প্রয়াস নেন। তিনি খামটির চারধার দিয়ে একটি সীমানা তৈরি করে দিয়েছেন, রক্তের রঙে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবি স্মরণে’ কথা কয়টি বার বার ব্যবহার করে। খামটির অন্য সব লেখাও তিনি লিখে দিয়েছেন রক্তের রঙে।

নক্সা ৩
কে জি মোসতফা একটি ছোট আকারের খামেরও নক্সা করেন, যাতে কেউ যদি অল্প কয়টি ডাকটিকিট বসিয়ে ব্যবহার করে তার জন্য।

নক্সা ৪
উদ্বোধনী দিনের তারিখ চিহ্নিত করার জন্য সিল মোহর ব্যবহারের জন্য কে জি মোসতফা এক অনন্য নক্সা উদ্ভাবন করেন। দুই ইঞ্চি বর্গের একটি গোল সূূর্য ও তার ষোলটি কোণ বিশিষ্ট রস্মি চারদিক উদ্ভাসিত করে দিচ্ছে। এতে চারটি বিপরীত দিকে ‘শহীদ বুদ্ধিজীবি’ ও ‘ঝযধযববফ ওহঃবষষবপঃঁধষ’ কথাটি রস্মির আকারে লেখা। সূর্যের গোল সীমার ভেতর ইংরেজি ও বাংলায় ঢাকা জিপিও কথাটি চক্রাকারে এবং মাঝে তারিখ ’১৪-১২-৯১’ কথাটি বসানো হয়েছে।

নক্সা ৫
এই উপলক্ষে একটি পরিচিতি পুস্তিকাও প্রকাশ করা হয়, যাতে ডাকটিকিটেরবিবরণী শ শহীদ বুদ্ধিজীবিদের সংক্ষিপ্ত জীবনীও সংযুক্ত করা হয়েছে ফলে পুস্তিকাটিও মূল্যবান হয়ে উঠেছে।

নক্সা ৬
১৯৯২ সাল ছাড়া ২০০০ সাল পর্যন- প্রতি বছরের এই দিনে দুই টাকা মূল্যমানের একই নক্সায় ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। ১৯৯১ সালে ৩০টি, ১৯৯৩ সালে ১০টি, ১৯৯৪ থেকে ২০০ সাল পর্যন- প্রতি বছর ১৬টি ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়। এ যাবত সর্ব মোট ১৫২ জন বুদ্দিজীবি স্মরনে ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয়েছে। ২০০০ সালের পর থেকে এই সিরিজে আর কোন ডাকটিকিট প্রকাশ করা হয় নাই।

শহীদদের ছবি সংগ্রহে শহীদ পরিবারের সদস্যবর্গ, দৈনিক পত্রিকাসমূহের সম্পাদকবৃন্দ, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক এবং অন্যান্য কর্মকর্তার সহযোগিতা গ্রহণ করা হয়। নকশা প্রণয়নে এবং সিরিজ প্রকাশের প্রস্তুতি গ্রহণে ডাক পরামর্শ কমিটির সদস্যবর্গের আন্তরিক সহযোগিতা স্মরণযোগ্য।
(আমার অপ্রকাশিত “শহীদ বুদ্ধিজীবী ” বই থেকে)

লেখক: লেখক,গবেষক,অনুবাদক,প্রাবন্ধিক, ডাকটিকিট ও মুদ্রা সংগ্রাহক এবং খণ্ডকালীন শিক্ষক- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন




themesads

© All rights reserved © 2020 crimefolder.com
কারিগরি সহযোগীতায়: Creative Zone IT