“দেয়ার আর মেনি থিংস এবাভ দি আর্থ এন্ড আন্ডার দি সান”!

“দেয়ার আর মেনি থিংস এবাভ দি আর্থ এন্ড আন্ডার দি সান”!

সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান,

আমি সাহিত্যের মানুষ, বিজ্ঞানের নই। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমি বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করতে পারিনি। কিন্তু কেন যেন পরিসংখ্যান আমার খুবি পছন্দের বিষয়। রোজই পরিসখ্যানবিদরা মজার মজার তথ্য দেন। আমি সেগুলো পড়ি আর বিমলানন্দ ভোগ করি। বিশ্বের সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক খবর ওদের কাছ থেকেই পাওয়া যায়।

যেমন ধরুন, একটি দেশে দুই জন মানুষ বাস করে, একজনের কাছে এক শ’ কোটি টাকা আছে আর একজনের কাছে কিছুই নেই। পরিসংখ্যান বলবে, ঐ দেশের মানুষের গড় সম্পদের পরিমান পঞ্চাশ কোটি টাকা। এক কলমের খোঁচায় পরিসংখ্যানবিদ একজন কপর্দকশূন্য মানুষকে পঞ্চাশ কোটি টাকার মালিক বানিয়ে দিলো। অন্যদিকে এক শ কোটি টাকার মালিককে তাঁর সম্পদ অর্ধেক কমিয়ে দিলো।
আবার দেখুন, বাংলাদেশ প্রতিবেশী সম্পদশালী দেশ থেকে সতেরো হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলো। আমি একজন অতি দরিদ্র মানুষ, দিন আনি দিন খাই, পরিসংখ্যানবিদের কলমের খোঁচায়, আমার ঘাড়ে এক হাজার কোটি টাকার ঋণ চেপে বসলো (সতেরো হাজার কোটি টাকা ভাগ সতেরো কোটি নাগরিক)। আমি কিচ্ছু করলাম না, আমার ঘাড়ে এক হাজার কোটি টাকার ঋণ চাপিয়ে দিলো পরিসংখ্যানবিদ।
কী দুশ্চিন্তা? “খাইলাম না, ছুইলাম না, লাগলো ভালো?”

আবার কিছু কিছু পরিসংখ্যান আমরা ইচ্ছে করে ভুলে যেতে চাই, ভুলে যাই, যেমন, গত এক বছরের খবরের কাগজের পাতায় ডাক্তারের অবহেলায় কতোগুলো মানুষের মৃত্যু-র খবর প্রকাশিত হয়েছে, তার পরিসংখ্যান আমরা একেবারে ভুলে মেরে দিয়েছি। এক ঢোঁক সেভেন আপের সাথে কুঁত করে গিলে ফেলেছি।

জাতির পিতাকে হত্যা করার জন্য আমরা অপরাধীদের দেশ-বিদেশ থেকে ধরে এনে বিচার করে ফাঁসীতে ঝোলাচ্ছি, যুদ্ধাপরাধীদের দেশ-বিদেশ থেকে ধরে এনে বিচার করে ফাঁসীতে ঝোলাচ্ছি, কিন্তু ডাক্তারদের এই সব অবহেলায় মানুষের ক্ষতি, মৃত্যু, তার কোন খবরই না। সেগুলি নিয়ে কোন আদালতে কোন বিচারই হয় না। অপরাধীকে আইনের সোপর্দ করা হয় না। কিংবা দুদিন আগে শুনলাম অকার্যকর কিডনী ফেলে দিতে গিয়ে ভালটাই ফেলে দিলেন বড় ডাক্তার। “ভুল হয়ে গিয়েছে!” কি প্রশান্তি! ঘটনাগুলো দেখছি আর ভুলে মেরে দিচ্ছি!

কিংবা প্রতিদিন, তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ, শত শত পথের নিরীহ পথচারী, রিক্সা যাত্রী, দোকানদার, কুঁড়েঘরে শুয়ে থাকা বাচ্চার ওপর রাস্তায় বাস, ট্রাক, কভারড ভ্যান তুলে দিয়ে তাদের ভবলীলা সাংগ করে দিয়ে গাড়ি ফেলে গায়েব হয়ে যাচ্ছে ড্রাইভার আর হেলপার। ‘ট্রাক/বাস আটক করা হয়েছে, “ড্রাইভার পলাতক” হা, হা, হা! সেই ড্রাইভারকে কোন কালেই আর পাওয়া যায় না।

কিংবা ব্যাংক থেকে পঞ্চাশ এক শ’ কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেল, তাঁর কোন ‘আপডেট খবর জানাই গেলো না। কিংবা প্যারাসিটামল খেয়ে আঠাশটা ছোট্ট বাচ্চা মরে গেল, অপরাধীকে খুজেই পেলাম না আমরা। কয়েক মাস পরে ভুলে মেরে দিলাম। কি আশ্চর্য আমাদের স্মৃতিশক্তি!
সাতচল্লিশ বছর আগের ঘটনা নিয়ে আমরা সবাই দেশ গরম করছি।

অথচ দুই মাস/ ছয় মাস আগের ঘটনা এক ঢোঁক পানির সাথে গিলে হজম করে ফেলছি!
কেবল ছয় মাস কেন, গত দশ বছর ধরে প্রতি দিন, আমাদের চারপাশের সীমান্তে আমাদের প্রতিবেশী “টার্গেট প্র্যাক্টিস” করতে করতে শত শত মানুষ মারছে, আমরা আমাদের “প্রিয়তম প্রতিবেশী”র এই “মহান” কাজ নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাই না।
কী মজার ব্যাপার, তাই না?

লেখক: লেখক, অনুবাদক, সংকলক, প্রাবন্ধিক, গবেষক, ডাকটিকিট ও মুদ্রা সংগ্রাহক। খণ্ডকালীন শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন




themesads

© All rights reserved © 2020 crimefolder.com
কারিগরি সহযোগীতায়: Creative Zone IT