বিনম্র শ্রদ্ধা জাতীয় চার নেতার প্রতি

বিনম্র শ্রদ্ধা জাতীয় চার নেতার প্রতি

সিরাজুল প্রিন্স,

আজ ৩রা নভেম্বর জেল হত্যা দিবস। এ দিন ১৯৭৫ সালে ইতিহাসের নৃশংস হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। মহান জননেতা তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ মানসুর আলী এবং আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা হন। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে হত্যার পর দেশকে নেতৃত্বশূন্য করার একটি ঘৃণ্য অপচেষ্টা এটি। প্রতি বছর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দল জাতীয় চারনেতার হত্যাকান্ডের স্মৃতি স্বরণ করতে এ দিবস পালন করে থাকে। জাতীয়, স্থানীয়, ব্যক্তি পর্যায় দেশজুড়ে বিভিন্ন আয়োজন করা হয়।

দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই চার নেতাকে দেশ এক করেছিল। আমৃত সেই একতা বজায় রেখেছেন তারা। ব্যক্তি জীবনে তারা ছিলেন আলাদা, বৈচিত্র্যময় এবং স্বকীয়। তাজউদ্দীন আহমদ ১৯২৫ সালে গাজীপুরের কাপাসিয়ার এক রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী , কুরানের হাফেজ ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি, আইন বিষয় পড়াশোনা করেছেন। ছাত্রলীগ, যুব লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। জীবনভর স্কাউট সদস্য ছিলেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম কিশোরগঞ্জ জেলার যশোদল দামপাড়ায় ১৯২৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। মুসলিম লীগ থেকে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেন।

মোহাম্মদ মনসুর আলী ১৯১৯ সালে সিরাজগঞ্জের রতনকান্দি ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং ল পাস করেন। পাকিস্তান আর্মিতে ক্যাপ্টেন পদে যোগদান করেন এবং পাবনা জেলা মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন।

আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান নাটোর মহকুমার বাগাতীপাড়া থানার নূরপুর গ্রামে ১৯২৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে অর্থনীতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল পাস করেন।

১৯৫২ সালে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ মনসুর আলী আওয়ামী লীগে যোগদান করেন এবং ভাষা আন্দোলনে ভূমিকার জন্য গ্রেফতার হন। তাজউদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে ভাষা আন্দোলনকালে গ্রেফতার হন, কারা ভোগ করেন। আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। প্রত্যেকে নিজ নিজ জেলা পর্যায় দলের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর বিভিন্ন সময় জাতীয়, প্রাদেশিক পর্যায় বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রথম ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করতে শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালে এ এইচ এম কামারুজ্জামান নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বিরোধী দলীয় উপনেতা নির্বাচিত হন। এম মনসুর আলী ১৯৬৬ সালে ছয় দফার সাথে ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত থাকেন। চারজনই ছয় দফায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯৭০ এর জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করেন।

নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি দৃঢ় হয়। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিয়ে কারাবরণ করলে দায়িত্ব পড়ে এই চার নেতার উপর। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে গঠিত মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে উপরাষ্ট্রপতি ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী হন। এ সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও বৈদেশিক সমর্থন আদায়ে ব্যাপক পারদর্শীতা দেখায়।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রত্যাবর্তন করলে তার সরকার এবং দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনঃনির্মাণের সহায়তা করেন এই চারনেতা। ১৮ জানুয়ারি ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার জন্য এ এইচ এম কামারুজ্জামান সরকারের মন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ২৬ অক্টোবর ১৯৭৪ সালে সরকারের মন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করে তাজউদ্দীন আহমদ রাজনীতি থেকে নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠনের পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান এবং এম মনসুর আলী প্রধানমন্ত্রী হন।

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে মতের এই পার্থক্যের পরও ২২ শে আগস্ট চারনেতা আটক হন। ৩রা নভেম্বর ১৯৭৫ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি দশায় এই চার নেতার রক্তের স্রোত এক হয়ে যায়। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের রচিত হয় দুঃখজনক ও অত্যন্ত লজ্জাজনক একটি অধ্যায়। যা প্রতি বছর বেদনাবিধুর হৃদয় নিয়ে জেল হহত্যা দিবস হিসেবে পালন করি।

বিনম্র শ্রদ্ধা এই জাতীয় মহান নেতাদের প্রতি।

লেখক: শিক্ষার্থী, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন




themesads

© All rights reserved © 2020 crimefolder.com
কারিগরি সহযোগীতায়: Creative Zone IT