মহামারি ঠেকাতে প্রবাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষকদের ৮ সুপারিশ

মহামারি ঠেকাতে প্রবাসী শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষকদের ৮ সুপারিশ

বিশ্বব্যাপী মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মোকাবিলায় দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষক।

বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি এই শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষকরা একটি বিবৃতিতে এই আহ্বান জানান। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো ওই বিবৃতিতে তারা এই মুহূর্তে করণীয় কয়েকটি সুপারিশ করেছেন।

অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, কানাডা, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত ১০৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষক এই বিবৃতি পাঠান।

উল্লেখ্য, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে চিনে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হয়। এরপর গত তিন মাসে পৃথিবীর ১৭৭টি দেশে ৫, ৯৮, ০৭০ জন আক্রান্ত এবং ২৭,৭৬১ জনের ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। গত ৮ মার্চ ২০২০ তারিখে বাংলাদেশে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি চিহ্নিত হয়। আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা শনিবার জানান, দেশে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৪৮ জন। এখন পর্যন্ত মারা গেছেন পাঁচজন।

বিবৃতিতে বলা হয়, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সরকার দেশে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন সীমিত করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, শুধুমাত্র লকডাউন করে নয় বরং সম্ভাব্য আক্রান্ত রোগীকে খুঁজে বের করে, পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শনাক্ত করে এবং তার প্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমেই একে মোকাবিলা করা সম্ভব।

বিবৃতিতে করোনা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে চিকিৎসা উপকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ১ কোটি ৯৫ লাখ লোকের বাস, সেখানে শুধুমাত্র ২৬ মার্চ ১৮,৬২৫ জনের টেস্ট করা হয়, যার মধ্যে ৬,৪৪৭ জন করোনা আক্রান্ত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ অঙ্গরাজ্যে ১২ থেকে ১৩ হাজার ভেন্টিলেটর রয়েছে। পরিস্থিতির বিবেচনায় সম্প্রতি একটি ভেন্টিলেটর দুজন আক্রান্ত রোগীর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে অঙ্গরাজ্যটি। তা সত্ত্বেও গভর্নরের আশঙ্কা যদি অবিলম্বে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা না করা যায় তাহলে অনেক রোগীর জীবন সংকটাপন্ন হবে।

বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের দেশে শুরুর দিকে রোগ-নির্ণয় কিট ছিল প্রায় ২০০০। আরও নতুন ৪০,০০০ কিট ইতিমধ্যে পৌঁছেছে। বর্তমানে দেশে মাত্র ২৯ টি ভেন্টিলেশন সুবিধা আছে! আরও ১০০ টি ভেন্টিলেশন সুবিধার প্রস্তুতি প্রক্রিয়াধীন যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এ পরিস্থিতিতে দল-মত নির্বিশেষে সকলে একত্রিত হয়ে আমাদের সীমাবদ্ধতাকে অনুধাবন করে তা সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।

বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি এই শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষকরা করোনা মহামারি ঠেকাতে নিম্মলিখিত বিষয়গুলো সুপারিশ করেছেন-

১। পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ঢাকাসহ সারা দেশে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত রোগ-নির্ণয় কিট, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এবং ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা। করোনার উপসর্গ উপস্থিতি হওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং মৃত-ব্যক্তিদের সৎকারসহ সমস্ত প্রক্রিয়ার সহজবোধ্যভাবে গাইডলাইন আকারে প্রকাশ ও প্রচার নিশ্চিত করা।

২। চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত চিকিৎসক, নার্সসহ সকলের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (PPE) সমেত পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সামগ্রী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা। এছাড়াও যেসব স্বেচ্ছাসেবক, মাঠকর্মী, এবং কর্মচারী মাঠপর্যায়ে কাজ করবে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৩। এ কাজে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীকে প্রস্তুত করা ও তাদের কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। অনেক মানুষ বিশেষত তরুণ এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠনের কর্মীবৃন্দ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে ইচ্ছা পোষণ করেছে। তাদেরকে নিরাপত্তা বিষয়ক ট্রেনিং প্রদান ও তাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা।

৪। শ্রমিক, কর্মজীবীসহ নিম্নবিত্ত মানুষদের জন্য আপত্কালীন সময়ে বিনা মূল্যে খাদ্যশস্য বিতরণ করা।একই সঙ্গে কঠোরভাবে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম নিয়ন্ত্রণ করা।

৫। লকডাউনকৃত এলাকায় সকল মানুষের মানবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা। করোনায় আক্রান্ত রোগী যাতে কোন ধরনের সামাজিক হয়রানি/বৈষম্যের শিকার না হয় তা নিশ্চিত করা।

৬। সামাজিক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ যেমন লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, আলেম-ওলেমাসহ বিভিন্ন ধর্মের বিদ্বানদের দিয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো। মানুষের মধ্যে আস্থা অর্জন ও দ্রুততার সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তথ্য আদান-প্রদানের সমস্ত বাধা দূর করা।

৭। বিভিন্ন শাখার গবেষকদের একত্রিত করে জরুরি ভিত্তিতে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার নিমিত্তে টিম তৈরি করা। যারা দেশীয় বাস্তবতায় দেশের অভ্যন্তরে কিভাবে পিপিই, অস্থায়ী বিশেষায়িত হাসপাতাল, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র থেকে শুরু করে কী পদ্ধতিতে সংগরোধ (কোয়ারেন্টাইন) করা যায়, সর্বোপরি সার্বিক বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেবেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অভিজ্ঞ ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন গবেষকের তত্ত্বাবধানে সমন্বিত করা।

৮। ইতিমধ্যে ড. বিজন কুমার শীল এবং তার গ্রুপ নিজস্ব উদ্যোগে করোনা নির্ণয় পদ্ধতি নিয়ে কাজ শুরু করছেন। দেশের গবেষকদের অনেকেই করোনা সম্পর্কিত গবেষণা কাজে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। দেশের বাইরের গবেষকদের অনেকেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত আছেন। তাঁদের সহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আশু এই মহামারি মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন




themesads

© All rights reserved © 2020 crimefolder.com
কারিগরি সহযোগীতায়: Creative Zone IT